ইসলামি মাসায়েল

ট্রাফিক পুলিশের মামলা থেকে বাঁচতে ঘুষ দেওয়ার বিধান

প্রশ্ন নং ১২৩: অসতর্কতাবশত কোনো ভুল—যেমন সিটবেল্ট না বাঁধা, গাড়ির অতিরিক্ত গতি ইত্যাদি—করার কারণে অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশ বড় অঙ্কের জরিমানা বা মামলা দিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে কিছু ঘুষ দিলে মামলা থেকে বাঁচা যায় বা জরিমানার পরিমাণ কমানো যায়। এভাবে ঘুষ দিয়ে মামলা থেকে বাঁচা বা জরিমানা কমানো কি বৈধ হবে? আবার অনেক সময় ঘুষ না দিলে ট্রাফিক পুলিশ অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত জরিমানা বা মামলা চাপিয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে জুলুম থেকে বাঁচার জন্য ঘুষ দিলে কি গুনাহ হবে?

উত্তর

ট্রাফিক আইন সাধারণত মানুষের নিরাপত্তা ও সুবিধার জন্য তৈরি করা হয়। তাই এসব আইনে শরিয়তবিরোধী কোনো বিধান না থাকলে তা মেনে চলা আবশ্যক।
প্রখ্যাত ফকীহ ইবনে আবিদীন রহ. বলেন—

وتجب طاعة الإمام عادلا كان أو جائرا إذا لم يخالف الشرع.

“শাসক ন্যায়পরায়ণ হোক বা জালিম—তার এমন নির্দেশ মান্য করা আবশ্যক, যা শরীয়াহ বিরোধী নয়।”
রদ্দুল মুহতার, ৪/২৬৩
সুতরাং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে কেউ যদি বাস্তবেই ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে থাকেন এবং তার ওপর আইনানুগ জরিমানা আরোপিত হয়, তাহলে সেই জরিমানা মাফ করিয়ে নেওয়া বা কমানোর জন্য পুলিশকে ঘুষ দেওয়া এবং পুলিশের তা গ্রহণ করা—উভয়ই নাজায়েয ও হারাম।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলািইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ

“রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহণকারী উভয়ের ওপর লানত করেছেন।”
জামে তিরমিযি, হাদিস: ১৩৩৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৮০

তবে কেউ যদি অন্যায়ভাবে জুলুমের শিকার হন এবং নিজের বৈধ অধিকার আদায় করা বা জুলুম থেকে বাঁচার অন্য কোনো উপায় না থাকে, তাহলে জুলুম প্রতিহত করার জন্য অর্থ প্রদান করলে অর্থ প্রদানকারীর গুনাহ হবে না। তবে অর্থগ্রহণকারীর জন্য তা ঘুষ হিসেবে গণ্য হবে এবং গ্রহণ করা নাজায়েয ও হারাম হবে।

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ মোল্লা আলী ক্বারী রহ. বলেন,

أما إذا أعطى ليتوصل به إلى حق، أو ليدفع به عن نفسه ظلماً فلا بأس به

“কেউ যদি নিজের বৈধ অধিকার আদায়ের জন্য অথবা নিজের ওপর থেকে জুলুম প্রতিহত করার জন্য অর্থ প্রদান করে, তাহলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।”
মিরকাতুল মাফাতীহ শরহু মিশকাতিল মাসাবীহ, ৭, / ২৯৫।
ইবনে আবিদীন রহ. আরও বলেন—

دفع المال للسلطان الجائر لدفع الظلم عن نفسه وماله ولاستخراج حق له ليس برشوة يعني في حق الدافع

“জালিম শাসকের পক্ষ থেকে নিজের ওপর বা নিজের সম্পদের ওপর সংঘটিত জুলুম প্রতিহত করার জন্য কিংবা নিজের কোনো বৈধ অধিকার আদায়ের জন্য অর্থ প্রদান করা—অর্থ প্রদানকারীর ক্ষেত্রে ঘুষ হিসেবে গণ্য হবে না।”
রদ্দুল মুহতার, ৬/ ৪২৩।

অতএব, বৈধ জরিমানা থেকে বাঁচার জন্য ঘুষ দেওয়া জায়েয নয়। তবে অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত জরিমানা, মিথ্যা মামলা বা জুলুম থেকে বাঁচার বৈধ কোনো উপায় না থাকলে এবং বাধ্য হয়ে অর্থ দিতে হলে, প্রদানকারীর গুনাহ হবে না। তবে গ্রহণকারীর ক্ষেত্রে তা অবশ্যই ঘুষ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং হারাম হবে।

فقط والله أعلم بالصواب

সারসংক্ষেপ
ট্রাফিক আইন মানুষের নিরাপত্তা ও সুবিধার জন্য প্রণীত হওয়ায়, শরিয়তবিরোধী কোনো বিধান না থাকলে তা মেনে চলা আবশ্যক। তাই কেউ বাস্তবেই ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে আইনানুগ জরিমানার মুখোমুখি হলে, জরিমানা মাফ বা কমানোর জন্য ঘুষ দেওয়া জায়েয নয়; ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়েই গুনাহগার হবে। তবে কেউ অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত জরিমানা, মিথ্যা মামলা বা জুলুমের শিকার হলে এবং তা থেকে বাঁচার কোনো বৈধ উপায় না থাকায় বাধ্য হয়ে অর্থ প্রদান করলে, প্রদানকারীর গুনাহ হবে না; তবে গ্রহণকারীর জন্য তা ঘুষ হিসেবে গণ্য হবে এবং হারাম হবে।
উত্তরদাতা
সম্পাদকমণ্ডলী
আধুনিক মাসায়েল
পরিসংখ্যান
১২৩
প্রশ্ন নম্বর
১১৭
দেখেছেন
৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
প্রকাশিত
? প্রশ্ন করুন