প্রশ্ন নং ১৩৫: সম্মানিত মুফতিয়ানে কেরাম, বদনজর (العين) কি সত্য ও বাস্তব বিষয়? বদনজরের কারণে মানুষের ক্ষতি হতে পারে কি? বদনজর কি নিজস্ব কোনো ক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করে, নাকি সবকিছু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও তাকদীরের অধীন? বদনজর থেকে বাঁচা ও এর প্রভাব দূর করার জন্য শরিয়তসম্মত কোনো দোআ ও রুকইয়া আছে কি? কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।
حامدا و مصليا و مسلما
বদনজর (العين) একটি সত্য ও বাস্তব বিষয়। বদনজর (العين) একটি সত্য ও বাস্তব বিষয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস থেকে বিষয়টি প্রমাণিত। হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
العَيْنُ حَقٌّ، وَلَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابَقَ الْقَدَرَ سَبَقَتْهُ الْعَيْنُ
অর্থ: “বদনজর সত্য। যদি কোনো কিছু তাকদীরকে অতিক্রম করতে পারত, তবে বদনজরই তা অতিক্রম করত।”
—সহীহ মুসলিম, হাদিস ন!: ২১৮৮।
উক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বদনজর কোনো কাল্পনিক বা কুসংস্কারপূর্ণ বিষয় নয়; বরং এর বাস্তবতা শরিয়ত দ্বারা স্বীকৃত।
তবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো, বদনজর নিজস্ব কোনো স্বাধীন ক্ষমতায় ক্ষতি করতে পারে না। বরং এর প্রভাবও আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও তাকদীরের অধীন। ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন—
ومذهب أهل السنة أن العين إنما تفسد وتهلك عند نظر العائن بفعل الله تعالى أجرى الله سبحانه وتعالى العادة أن يخلق الضرر عند مقابلة هذا الشخص لشخص آخر
অর্থ: “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাযহাব হলো, বদনজর কেবল তখনই ক্ষতি বা ধ্বংস করে, যখন আল্লাহ তাআলা তা করেন। আল্লাহ তাআলা এমন নিয়ম জারি করেছেন যে, এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির দিকে তাকালে তিনি (আল্লাহ) ক্ষতি সৃষ্টি করেন।”
—শরহে নববী, ১/৯।
অতএব, বদনজরকে স্বাধীন কোনো শক্তি মনে করা যাবে না। এর প্রভাব আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি ও হুকুমেই সংঘটিত হয়।
বদনজরের জন্য রুকইয়া
বদনজরের ক্ষতি থেকে বাঁচা এবং এর প্রভাব দূর করার জন্য শরিয়তসম্মত রুকইয়া ও দোআ করা বৈধ। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত—
أَمَرَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أَسْتَرْقِيَ مِنَ الْعَيْنِ
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বদনজরের জন্য রুকইয়া করতে নির্দেশ দিয়েছেন।”
—সহীহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৭৩৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২১৯৫।
জগতবিখ্যাত মুফাস্সির আল্লামা শিহাবুদ্দীন আলুসী রহ. সূরা ইউসূফের ৬৭ নম্বর আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেন—
فقد صرحوا بأن الأدعية والرقي من جملة الأسباب لدفع أذى العين بل إن من ذلك ما يكون سبباً لرد سهم العائن إليه
“আলিমগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, দোআ ও রুকইয়া বদনজরের ক্ষতি দূর করার অন্যতম মাধ্যম। বরং এর মধ্যে এমন কিছু রয়েছে, যা বদনজরের তীরকে পুনরায় নজর প্রদানকারীর দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে।”
—রুহুল মাআনী, ১/২৪৯১।
বদনজরের জন্য সংক্ষিপ্ত রুকইয়ার দোআ
১.
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
অর্থ: “আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর বদনজর থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”
২.
بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ
অর্থ: “আল্লাহর নামে তোমার ওপর রুকইয়া করছি—যে কোনো কষ্টদায়ক বিষয় থেকে, প্রত্যেক ব্যক্তি ও হিংসুকের বদনজরের অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ তোমাকে সুস্থতা দান করুন। আল্লাহর নামেই তোমার ওপর রুকইয়া করছি।”
৩.
بِسْمِ اللَّهِ يُبْرِيكَ، وَمِنْ كُلِّ دَاءٍ يَشْفِيكَ، وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ ذِي عَيْنٍ
অর্থ: “আল্লাহর নামে তিনি তোমাকে আরোগ্য দান করুন; প্রত্যেক রোগ থেকে তোমাকে সুস্থ করুন; হিংসুক যখন হিংসা করে তখন তার অনিষ্ট থেকে এবং প্রত্যেক বদনজরওয়ালার অনিষ্ট থেকে (তোমাকে রক্ষা করুন)।”
এ ছাড়া বদনজরের ক্ষেত্রে সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে রুকইয়া করা যায়।
সুতরাং, বদনজর সত্য ও বাস্তব বিষয়; তবে এর কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই। এর প্রভাব আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও তাকদীরের অধীন। বদনজরের ক্ষতি থেকে বাঁচতে এবং এর প্রভাব দূর করতে কুরআন-সুন্নাহসম্মত দোআ ও রুকইয়া করা শরিয়তসম্মত।
দ্রষ্টব্য: শরহে নববী, ১/১৩৯২; মিরকাতুল মাফাতীহ, ১/২০; তুহফাতুল আহওয়াযী, ১/৯; ইরশাদুস সারী, ১/৫৩৪৩; আল-কাওয়াকিবুদ দারারী, ১/৫৩৭৫; মুসনাদে আহমাদ, ১/৮০১৮।
والله أعلم بالصواب