প্রশ্ন নং ১৩৬: কিস্তিতে পণ্য কেনার হুকুম কী? দোকানদার যদি নগদ ও কিস্তির মূল্য আলাদাভাবে জানিয়ে দেয় এবং কিস্তির মূল্য নগদের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে কি এটা সুদ হবে? আর আজকাল বিভিন্ন দোকানে "০% EMI"-তে পণ্য কেনার সুযোগ দেওয়া হয়, ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির মাধ্যমে এভাবে কেনাকাটা করা কি জায়েজ হবে?
অন্যদিকে, প্রচলিত “০% EMI”-তে সাধারণত ব্যাংক বা ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেনদেন হয় এবং নির্ধারিত সময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হলে ইন্টারেস্ট বা অতিরিক্ত চার্জ আরোপের শর্ত থাকে, তাই এ ধরনের EMI সুদি ঋণ-কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় শরিয়তসম্মত নয় এবং এ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
কিস্তিতে পণ্য ক্রয় করা নিম্নোক্ত শর্ত সাপেক্ষে জায়েজ। শর্তগুলো পাওয়া গেলে নগদ মূল্যের তুলনায় কিস্তিতে পণ্যের মূল্য বেশি নির্ধারণ করাও বৈধ।
১. চুক্তির সময় নগদে নাকি কিস্তিতে—কোন পদ্ধতিতে বিক্রি হচ্ছে তা নির্ধারিত হতে হবে এবং একটি মূল্য চূড়ান্ত করতে হবে।
২. কিস্তি ও পরিশোধের মেয়াদ নির্ধারিত হতে হবে।
৩. কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব হলে অতিরিক্ত কোনো টাকা বা জরিমানা নেওয়া যাবে না।
৪. নির্ধারিত সময়ের আগে মূল্য পরিশোধ করলে মূল্য কমিয়ে দেওয়ার শর্ত রাখা যাবে না।
প্রখ্যাত ফকীহ মুফতী তাকী উসমানী দা. বা. বলেন,
“أمّا الأئمة الأربعة وجمهور الفقهاء والمحدثین فقد أجازوا البیع المؤجل بأکثر من سعر النقد، بشرط أن یبتّ العاقدان بأنّه بیع مؤجل بأجل معلوم وبثمن متفق علیه عند العقد.”
অর্থ: “চার মাযহাবের ইমাম ও অধিকাংশ ফকীহ-মুহাদ্দিস নগদ মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে বাকিতে বিক্রয়কে জায়েজ বলেছেন, এই শর্তে যে, চুক্তির সময়ই ক্রেতা-বিক্রেতা নির্দিষ্ট মেয়াদ ও সম্মত মূল্যসহ তা বাকি বিক্রয় বলে চূড়ান্ত করে নেবে।” (বুহূস ফী কাযায়া ফিকহিয়্যা মু’আসিরা, ১/৭)
ইসলামফিকহ একাডেমী জেদ্দাহ্র সিদ্ধান্তেও একই মূলনীতি এসেছে,
“تجوز الزيادة في الثمن المؤجل عن الثمن الحال، كما يجوز ذكر ثمن المبيع نقدًا، وثمنه بالأقساط لمدد معلومة، ولا يصح البيع إلا إذا جزم العاقدان بالنقد أو التأجيل.”
অর্থ: “নগদ মূল্যের চেয়ে বাকির মূল্য বেশি হওয়া জায়েজ। তেমনি নগদ মূল্য এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের কিস্তির মূল্য উল্লেখ করাও জায়েজ। তবে ক্রেতা-বিক্রেতা নগদ বা বাকি—যেকোনো একটির ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত বিক্রয় সহীহ হবে না।” (ইসলামফিকহ একাডেমী, জেদ্দাহ, ১/১৬৬)
অতএব, প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে দোকানদার যদি আগে থেকেই নগদ ও কিস্তির মূল্য উল্লেখ করে দেন এবং ক্রেতা কিস্তিতে কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় একটি নির্দিষ্ট মোট মূল্য, কিস্তির পরিমাণ ও মেয়াদ চূড়ান্ত করে চুক্তি করেন, তাহলে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ হবে। কিস্তির মূল্য নগদ মূল্যের চেয়ে বেশি হলেও তা সুদ হিসেবে গণ্য হবে না।
তবে প্রশ্নে বর্ণিত “০% EMI”-এর ক্ষেত্রে যেহেতু সাধারণত কোনো ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির মাধ্যমে লেনদেনটি সম্পন্ন হয় এবং নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধ না করলে ইন্টারেস্ট বা অতিরিক্ত চার্জ আরোপের শর্ত থাকে, তাই এ ধরনের EMI শরিয়তসম্মত নয়। কেননা ঋণের ওপর অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের শর্ত সুদের অন্তর্ভুক্ত,
“أنّ العقد یُصرّح بأنّ حامل البطاقة إن لم یُسدّد الفاتورة خلالَ فترة السّماح، الّتی هیَ عادةً شهرٌ، فإنّ المصدر یتقاضی علیه زیادةً، فإنّ مثل هذا الاشتراط محرّمٌ شرعاً لکونه ربا.”
অর্থ: ” যেখানে চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে যে, কার্ডধারী যদি নির্ধারিত সময়সীমার (যা সাধারণত এক মাস হয়ে থাকে) মধ্যে বিল পরিশোধ না করে, তাহলে প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান তার ওপর অতিরিক্ত অর্থ আরোপ করবে—এ ধরনের শর্ত আরোপ শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম, কেননা তা সুদ।”
(ফিকহুল বুয়ূ, ১/৪৬২)
সুতরাং, এ ধরনের প্রচলিত ব্যাংক/ফাইন্যান্স কোম্পানির EMI-এর মাধ্যমে পণ্য ক্রয় করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
আরও দ্রষ্টব্য: আল-মাবসূত লিস সারাখসী ১৩/৮-৯ | আল-হিদায়া ৩/৭৬ | রদ্দুল মুহতার ৫/১৩২ | আল-বাহরুর রায়িক ৬/১১৩ | শরহুল মাজাল্লা লি সলীম রুস্তম বায (মাদ্দা ২৪৫-২৪৬) পৃ. ১২৫ | বুহূস ফী কাযায়া ফিকহিয়্যা মু’আসিরা পৃ. ৭ | ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৩/১৩ | ফাতহুল কাদীর ৬/২৬২
والله أعلم بالصواب