প্রশ্ন নং ৬৮:
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একে অপরের যৌনাঙ্গে মুখ ব্যবহার করা, যেমন—যৌনাঙ্গে চুম্বন করা বা মুখে নেওয়া—এর শরয়ী বিধান কী? এটি জায়েয, মাকরূহ নাকি হারাম? কুরআন-সুন্নাহর দলিলের আলোকে বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।
بسم الله الرحمن الرحيم
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, শরিয়ত যেসব পন্থা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেনি, সেসব পন্থায় পরস্পর যৌনসুখ গ্রহণের অবকাশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَّكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّىٰ شِئْتُمْ
“তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা নিজেদের শস্যক্ষেত্রে যাও যেদিক দিয়ে ইচ্ছা।”
(সূরা আল-বাকারা, আয়াত :২২৩)
তবে স্বামী-স্ত্রীর যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইসলামী শিষ্টাচার ও নীতি-নৈতিকতার প্রতি আমাদের লক্ষ্য রাখা জরুরি। বিশেষত যেসব পন্থা শরিয়ত স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে, তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক; যেমন—মলদ্বারে সহবাস এবং ঋতুস্রাব (حيض) ও প্রসবোত্তর রক্তস্রাব (نفاس) চলাকালে সহবাস।
স্বামী-স্ত্রীর যৌনাঙ্গে মুখ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়—যৌনাঙ্গ নাপাক পদার্থের সংস্পর্শে আসতে পারে এবং সেখান থেকে নাপাক পদার্থ বের হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। যেমন, পুরুষের যৌনাঙ্গ থেকে প্রস্রাব, মযি ইত্যাদি নাপাক পদার্থ বের হতে পারে; অনুরূপভাবে নারীর যৌনাঙ্গেও নাপাক পদার্থের উপস্থিতি বা নির্গমনের সম্ভাবনা থাকে। নাপাক পদার্থ মুখে নেওয়া বা মুখকে নাপাকির সংস্পর্শে আনা শরিয়তসম্মত নয়; সুতরাং নাপাকি লাগা বা প্রবেশের আশঙ্কা থাকলে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
স্ত্রীর মুখে স্বামীর যৌনাঙ্গ প্রবেশ করানোর বিষয়ে কুরআন-হাদিসে সরাসরি নিষেধাজ্ঞার কোনো স্পষ্ট দলিল পাওয়া যায় না, তাই একে অকাট্যভাবে হারাম বলা যায় না। ফিকহের কিতাবগুলোতেও এ বিষয়ে জাওয়াজ (বৈধতা) ও কারাহাত—উভয় ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়।
প্রসিদ্ধ হানাফি ফকিহ বুরহানুদ্দীন মাহমুদ ইবন তাজুদ্দীন রহ. বলেন,
إذا أدخل الرجل ذكره في فم امرأته يكره لأنه موضع قراءۃ القرآن فلا یلیق به إدخال الذکر به
“পুরুষ নিজের লজ্জাস্থান স্ত্রীর মুখে প্রবেশ করালে তা মাকরূহ হবে। কেননা, মুখ কুরআন তিলাওয়াতের স্থান; সুতরাং সেখানে লজ্জাস্থান প্রবেশ করানো অনুচিত।”
(আল-মুহীতুল বুরহানী, ৮/১৩৪)
অন্যদিকে আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা-তে মাকরূহ হওয়ার পাশাপাশি ভিন্ন মতও উল্লেখ করা হয়েছে,
إذا أدخل الرجل ذكره في فم امرأته قد قيل يكره وقد قيل بخلافه كذا في الذخيرة
“পুরুষ তার স্ত্রীর মুখে নিজের লজ্জাস্থান প্রবেশ করালে—কেউ বলেছেন তা মাকরূহ, আবার কেউ এর বিপরীত মতও ব্যক্ত করেছেন।”
(আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, ৫/৩৭২)
এ ছাড়া আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা-তে হাম্বলি ফকিহদের বক্তব্য হিসেবে এসেছে,
وصرح الحنابلة بجواز تقبيل الفرج قبل الجماع وكراهته بعده
“হাম্বলি ফকিহগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, সহবাসের পূর্বে লজ্জাস্থানে চুম্বন করা জায়েয এবং সহবাসের পরে তা মাকরূহ।”
(আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা, ৯/৩২ ও ৩২/৯০)
দারুল উলুম দেওবন্দের একটি ফতোয়ায় স্বামী-স্ত্রীর লজ্জাস্থানে চুম্বনকে ইসলামী আদব-শিষ্টাচারের পরিপন্থী বলে তা থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে—যে মুখ দিয়ে আল্লাহর জিকির করা হয়, তা দ্বারা লজ্জাস্থানে চুম্বন করা উপযুক্ত নয়। তবে প্রবল যৌন আকর্ষণের কারণে কেউ এমনটি করে ফেললে এবং লজ্জাস্থানে নাপাকি না থাকলে, তাকে সরাসরি নাজায়েয বা হারাম বলা হবে না।
এছাড়াও এতে স্বস্থ ঝুকিও আছে। তাই স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের যৌনাঙ্গে মুখ ব্যবহার করা সমীচীন নয়। এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত।
সারাংশ
স্বামী-স্ত্রীর যৌনাঙ্গে মুখ দেওয়ার ক্ষেত্রে নাপাকি লাগা বা প্রবেশের আশঙ্কা থাকলে তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক—বিশেষত স্বামীর যৌনাঙ্গ স্ত্রীর মুখে প্রবেশ করানোর ক্ষেত্রে মযি-বীর্যাদি নাপাক পদার্থ প্রবেশের আশঙ্কা থাকায় বিষয়টি সতর্কতার দাবি রাখে। নাপাকির বিষয়টি না থাকলেও এ কাজের স্বতন্ত্র হুকুম নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে—কেউ মাকরূহ বলেছেন, কেউ জাওয়াযের কথা বলেছেন—ফলে একে সর্বাবস্থায় অকাট্যভাবে হারাম বলা যায় না। তবে নাপাকির আশঙ্কা, ফিকহি মতভেদ ও ইসলামী শিষ্টাচারের বিবেচনায় এ থেকে বিরত থাকাই অধিক সতর্কতা ও শ্রেয়।
দ্রষ্টব্য: আল-মুহীতুল বুরহানী, ৮/১৩৪; আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, ৫/৩৭২; আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা, ৯/৩২; আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা, ৩২/৯০। দারুল উলুম দেওবন্দ, ফাতওয়া নং, Fatwa: 961-922/L=7/1438
والله أعلم بالصواب