প্রশ্ন নং ১৩৮:
আমার পিতা ইন্তেকাল করেছেন। জীবদ্দশায় তিনি আমার মায়ের মহর পরিশোধ করেননি। পিতার ইন্তেকালের পর আত্মীয়-স্বজন আমার মাকে চাপ প্রয়োগ করে তাঁর খাটিয়ার পাশে বসিয়ে কানের কাছে বলিয়ে নেয় যে, “আমি আমার মহর মাফ করে দিলাম।”
জানার বিষয় হলো—এভাবে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মহর মাফ করে দেওয়ার দ্বারা কি আমার পিতার জিম্মা থেকে মহর পরিশোধের দায় রহিত হয়ে গেছে? নাকি আমার মা এখনো তাঁর মহরের হকদার রয়েছেন? যদি তিনি হকদার হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর মহর কার পক্ষ থেকে এবং কীভাবে আদায় করা হবে?
بسم الله الرحمن الرحيم
মহর স্ত্রীর শরিয়তসম্মত আবশ্যকীয় হক ও অধিকার, যা স্বামীর জন্য পরিশোধ করা অপরিহার্য। স্ত্রী স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও সন্তুষ্টচিত্তে মহর মাফ করে দিলে তা মাফ হয়ে যায়। কিন্তু সামাজিক বা মানসিক চাপ, জোর-জবরদস্তি কিংবা ভয়-ভীতির মাধ্যমে মহর মাফ করিয়ে নেওয়া হলে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে স্বতঃস্ফূর্ত মাফ হিসেবে গণ্য হবে না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً ۖ فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيئًا
“তোমরা নারীদের তাদের মহর স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করো। অতঃপর তারা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার কোনো অংশ তোমাদের জন্য ছেড়ে দেয়, তাহলে তা সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করো।”
(সূরা আন-নিসা: ৪)
প্রখ্যাত ফকিহ আল্লামা ইবনে নুজাইম রহ. বলেন—
وَلَا بُدَّ فِي صِحَّةِ حَطِّهَا مِنَ الرِّضَا حَتَّى لَوْ كَانَتْ مُكْرَهَةً لَمْ يَصِحَّ
“মহর মাফ করার শুদ্ধতার জন্য স্ত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি থাকা আবশ্যক। তাকে বাধ্য করা হলে তা শুদ্ধ হবে না।”
(আল-বাহরুর রায়েক, ৩/২৬৪)
সুতরাং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করে আপনার মায়ের মুখ দিয়ে মহর মাফ করিয়ে নেওয়ার দ্বারা আপনার পিতার জিম্মা থেকে মহর পরিশোধের দায় রহিত হয়নি। আপনার মা এখনো তাঁর অনাদায়ী মহরের পূর্ণ হকদার রয়েছেন। এই মহর আপনার পিতার রেখে যাওয়া ত্যাজ্য সম্পদ থেকে আদায় করতে হবে।
হযরত আতা রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে,
سُئِلَ عَنْ امْرَأَةٍ مَاتَ زَوْجُهَا وَلَمْ يَفْرِضْ لَهَا صَدَاقًا، فَقَالَ: لَهَا صَدَاقُهَا وَالْمِيرَاثُ
“ইবনে আব্বাস রা.-কে এমন এক নারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, যার স্বামী ইন্তেকাল করেছেন এবং তাঁর জন্য মহর নির্ধারণ করা হয়নি। তিনি বললেন, তার জন্য মহরও রয়েছে এবং মিরাসও রয়েছে।”
(আস-সুনানুল কুবরা লিল-বায়হাকী, ৭/৪০৩)
অতএব, স্ত্রীর মহরের অধিকার এবং মিরাসের অধিকার পৃথক। একটি অধিকার অন্যটির কারণে রহিত হয় না।
সুতরাং আপনার পিতার রেখে যাওয়া ত্যাজ্য সম্পদ থেকে প্রথমে প্রয়োজনীয় কাফন-দাফনের ব্যয় বহন করা হবে। এরপর তাঁর ওপর থাকা ঋণ ও অন্যান্য দায়-দেনা, যার মধ্যে আপনার মায়ের অনাদায়ী মহরও অন্তর্ভুক্ত, পরিশোধ করা হবে। এরপর বৈধ অসিয়ত থাকলে তা সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সম্পদের মধ্যে কার্যকর করা হবে। অতঃপর অবশিষ্ট সম্পদ শরিয়াহ নির্ধারিত হারে ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
এভাবে আপনার মা প্রথমে তাঁর মহরের পাওনা গ্রহণ করবেন এবং এরপর অবশিষ্ট ত্যাজ্য সম্পত্তিতে একজন ওয়ারিশ হিসেবে তাঁর শরিয়তনির্ধারিত অংশও পাবেন।
দ্রষ্টব্য:
১. আল-বাহরুর রায়েক, কিতাবুন নিকাহ, বাবুল মহর, ৩/২৬৪।
২. আস-সুনানুল কুবরা লিল-বায়হাকী, কিতাবুন নিকাহ, ৭/৪০৩।
৩. আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা, কিতাবুন নিকাহ, ১/৩১৩।
৪. আল-বাহরুর রায়েক, ৮/৫৫৭।
والله تعالى أعلم بالصواب