প্রশ্ন নং ১৩২: বর্তমান যুগে একটি সম্মানজনক ও স্বাবলম্বী জীবনযাপনের তাগিদে মৌলিক দ্বীনি জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাকে দ্বীনি শিক্ষার ওপর প্রাধান্য দেওয়া এবং সন্তানকে সেভাবে গড়ে তোলা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ কি না? কেননা আমরা আলেমদেরকে অস্বচ্ছল ও গরিব হিসেবেই দেখে আসছি।
প্রথমত, মনে রাখা দরকার যে, জীবিকা ও রিজিক কোনো বিশেষ শিক্ষা, ডিগ্রি বা পেশার ওপর এককভাবে নির্ভরশীল নয়। বাস্তব জীবনে দেখা যায়, অনেক উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ ব্যক্তিও দারিদ্র্য ও অর্থকষ্টে জীবনযাপন করেন। আবার তাদের তুলনায় অনেক স্বল্পশিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর ব্যক্তিও বিপুল সম্পদের অধিকারী। সুতরাং আধুনিক শিক্ষা লাভ করলেই রিজিক বা অর্থসংস্থান নিশ্চিতভাবে সুদৃঢ় হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
রিজিকের প্রকৃত ব্যবস্থা আল্লাহ তাআলার হাতে। তিনি তাঁর হেকমত ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী বান্দাকে রিজিক দান করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
﴿وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا﴾
“আর তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর কাজ সম্পন্ন করবেনই; আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করে রেখেছেন।”
(সূরা তালাক, আয়াত : ৩)
অতএব, সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবিকা ও স্বাবলম্বিতার বিষয়টি কেবল আধুনিক শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল—এমন ধারণা শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।
একইভাবে এ কথাও সঠিক নয় যে, আলেম ও মাদ্রাসার শিক্ষকগণ সবাই চরম অর্থকষ্টে জীবনযাপন করেন। বাস্তবে বহু আলেম রয়েছেন, যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, বিত্তশালী এবং সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। আর এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রকৃত ধনাঢ্যতা কেবল ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের নাম নয়; বরং অন্তরের তুষ্টি ও আত্মিক প্রশান্তিই প্রকৃত ধনাঢ্যতা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
عن أبي هريرة قال: قال رسول الله ﷺ: ليس الغنى عن كثرة العرض، ولكن الغنى غنى النفس.
“ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের নাম প্রকৃত ধনাঢ্যতা নয়; বরং প্রকৃত ধনাঢ্যতা হলো অন্তরের ধনাঢ্যতা (আত্মিক তুষ্টি)।”
(তিরমিযী শরীফ, কিতাবুয যুহদ, ২/৬২)
সুতরাং কেবল বাহ্যিক আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে আলেমদের জীবন বা দ্বীনি শিক্ষার মূল্যায়ন করা সমীচীন নয়। দ্বীনি শিক্ষা অর্জন ও তা শিক্ষা দেওয়ার কাজে যে আত্মিক প্রশান্তি, আল্লাহর নৈকট্য এবং পরকালীন কল্যাণের আশা রয়েছে, তা কেবল পার্থিব উপার্জনের মানদণ্ডে পরিমাপ করা যায় না। তাই আর্থিক স্বচ্ছলতার বিষয়টিকে অজুহাত বানিয়ে দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা ও ফজিলত থেকে বিমুখ হওয়াও সমীচীন নয়।
দ্বিতীয়ত, শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘ইলম’ বা প্রকৃত জ্ঞানের সর্বোচ্চ মর্যাদা কুরআন-সুন্নাহ ও শরিয়তের জ্ঞানের। এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
عن عبد الله بن عمرو بن العاص رضي الله تعالى عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: «العلم ثلاثة، فما سوى ذلك فهو فضل؛ آية محكمة، وسنة، وفريضة عادلة».
“প্রকৃত জ্ঞান মূলত তিনটি। এগুলোর বাইরে যা কিছু আছে তা অতিরিক্ত; (১) সুস্পষ্ট আয়াত, অর্থাৎ কুরআনের জ্ঞান; (২) সুপ্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ তথা হাদিসের জ্ঞান; এবং (৩) দ্বীনের অন্যান্য বিধানের জ্ঞান।”
(জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহ, ইবনে আবদিল বার, হাদীস নং : ১৭৪)
এ কারণেই শরিয়তের জ্ঞানকে মানুষের জীবনের মূল ও মৌলিক জ্ঞান হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে উমদাতুল ক্বারীর ভাষ্য হলো—
فيفهم منه أن العلم لا يطلق إلا على علم الشريعة.
“এ থেকে অনুধাবন করা যায় যে, ‘ইলম’ বা প্রকৃত জ্ঞান শব্দটি শরিয়তের জ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় না।”
(উমদাতুল ক্বারী শরহু সহিহিল বুখারী, ২/৪২)
অতএব, দ্বীনি শিক্ষার ওপর আধুনিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া বা আধুনিক শিক্ষাকে দ্বীনি শিক্ষার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করার সুযোগ নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে, উপকারী আধুনিক জ্ঞান অর্জন করা নিষিদ্ধ বা অপ্রয়োজনীয়। বরং উভয়ের উদ্দেশ্য ও মর্যাদা পৃথকভাবে বোঝা জরুরি। দ্বীনি জ্ঞান হলো মুসলমানের ঈমান, ইবাদত ও জীবন পরিচালনার মৌলিক ভিত্তি। আর আধুনিক বিভিন্ন জ্ঞান ও দক্ষতা দুনিয়ার জীবন পরিচালনা, জীবিকা অর্জন এবং ব্যক্তি ও সমাজের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম হতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রত্যেক মুসলমানের ওপর দ্বীনি শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস বা আলেম কোর্স সম্পন্ন করা ফরজে আইন নয়। তবে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য নিজের জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা ফরজে আইন। যেমন—পবিত্রতা, নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম এবং নিজের ওপর প্রযোজ্য অন্যান্য শরয়ি বিধান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। একইভাবে শরিয়তসম্মত জীবনযাপন করা, শরিয়তসম্মত পোশাক-পরিচ্ছদ ও শালীনতা অবলম্বন করা এবং অন্যায় ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
এছাড়াও সন্তানকে দ্বীনি আদব-আখলাক ও প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা দেওয়াও অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
عن جابر بن سمرة قال: قال رسول الله ﷺ: لأن يؤدب الرجل ولده خير من أن يتصدق بصاع.
“কোনো ব্যক্তির নিজ সন্তানকে ভালো আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া এক ‘সা’ (পরিমাপক পাত্র) পরিমাণ খাদ্য সদকা করার চেয়েও উত্তম।”
(তিরমিযী শরীফ, কিতাবুল বির্রি ওয়াস-সিলাহ, ২/১৬)
সুতরাং সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ঈমান, আকিদা, ইবাদত, আদব-আখলাক ও প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞানের শিক্ষা। এর পাশাপাশি তার ভবিষ্যৎ জীবন, ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সমাজের প্রয়োজন এবং বৈধ জীবিকা অর্জনের সক্ষমতা বিবেচনা করে উপকারী আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেওয়াও শরিয়তসম্মত।
অতএব, মৌলিক দ্বীনি জ্ঞান ও শরিয়তের অনুগত জীবনযাপন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সন্তানকে চিকিৎসা, প্রকৌশল, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা, প্রশাসন, ভাষা কিংবা অন্যান্য উপকারী ও বৈধ ক্ষেত্রে শিক্ষা দেওয়া নিজে শরিয়তবিরোধী নয়। তবে আধুনিক শিক্ষা অর্জনের কারণে যেন ঈমান, আমল, ইসলামী আদব-আখলাক এবং শরিয়তের বিধান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এ বিষয়টি অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে।
দ্রষ্টব্য:
১. আল-কুরআন, সূরা তালাক, আয়াত : ৩।
২. তিরমিযী শরীফ, কিতাবুয যুহদ, ২/৬২।
৩. জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহ, ইবনে আবদিল বার, হাদীস নং : ১৭৪।
৪. উমদাতুল ক্বারী শরহু সহিহিল বুখারী, ২/৪২।
৫. তিরমিযী শরীফ, কিতাবুল বির্রি ওয়াস-সিলাহ, ২/১৬।
والله أعلم بالصواب