ইসলামি মাসায়েল

বিবাহের বৈধতা

প্রশ্ন নং ১৫০:

একটি মাসআলা জানার জন্য আপনার শরণাপন্ন হলাম।

ঘটনার বিবরণ:
১. একজন অবিবাহিত ছেলে এবং একজন অবিবাহিত মেয়ে (উভয়ই প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান এবং হানাফি মাযহাবের অনুসারী) নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় কাগজে লিখিতভাবে দিয়ে কাগজে স্বাক্ষর করেছেন সাক্ষীদের সামনে।
২.কাগজটি কোন কাবিননামা ছিল না,একটি দলিলের কাগজ ছিল যেখানে স্‌বামী স্ত্রী পরিচয় লিপিবদ্ধ করে ছেলে ও মেয়ে সেখানে সাক্ষীদের সামনে সাইন করেছে।
৩. সেখানে উপস্থিত সাক্ষীরাই মূলত তাদের বলেছিলেন, "আপনারা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন।"

সাক্ষীদের কথা অনুযায়ীই তারা ওই কাগজে নিজেদের স্‌বামী স্ত্রী হিসাবে লিখে বা পরিচয় লিপিবদ্ধ করেন এবং স্বাক্ষর করেন, যেখানে সাক্ষীরাও জানতেন তারা অবিবাহিত ছিলেন।

জানার বিষয়:

ক) মুখে ইজাব ও কবুল (বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ) না করে, কেবল সাক্ষীদের কথায় কাগজের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় লিখে স্বাক্ষর করলে কি হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে?

খ) যদি কাগজে স্পষ্ট করে বিবাহের ইজাব-কবুলের শব্দ লেখা না থাকে, তবে শুধু "আমরা স্বামী-স্ত্রী" এই স্বীকারোক্তিতে ছেলে মেয়ের উভয়ের নিজ ইচ্ছায় স্বাক্ষর করার দ্বারা কি শরিয়তের দৃষ্টিতে নিকাহ (বিয়ে) সংঘটিত হয়?

গ)কাগজে স্‌বামীর ঘরে ছেলের নাম লেখা হয়েছিল এবং স্ত্রীর ঘরে মেয়ের নাম লেখা হয়েছিল সাক্ষীদের সামনে এবং সাক্ষীদের সামনে ছেলে মেয়ে সেখানে সইও করে,এভাবে কি বিবাহ হয়ে গেছে?

ঘ)ছেলের সাথে এর পর মেয়ের কোন কারণে সহবাস হয়ে থাকলে তা কি বিবাহ বহির্ভুত সহবাস নাকি হালাল সহবাস হিসাবে গণ্য হবে?

ঙ)এই পুরো ঘটনার মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন কি হয়ে গেছে?

চ)মেয়েটি কি পরবর্তীতে শরিয়ত মোতাবেক অন্য কোনো ছেলেকে বিয়ে করতে পারবে? নাকি এর জন্য তাকে ওই ছেলের কাছ থেকে তালাক নিতে হবে?

কুরআন ও হাদিসের আলোকে সঠিক সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم
বিবাহের মজলিসে বর-কনে উভয়ে উপস্থিত ও কথা বলতে সক্ষম হলে শুধু কাগজে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় লিখে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে নিকাহ সংঘটিত হয় না। নিকাহ সংঘটিত হওয়ার জন্য সাক্ষীদের উপস্থিতিতে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হওয়া আবশ্যক। শুধু স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরস্পরকে স্বীকার করা বা লিখিতভাবে উল্লেখ করাও নিকাহের ইজাব-কবুলের বিকল্প নয়।
ফকীহ আলাউদ্দিন কাসানী (রহ.) বলেন—
رُكْنُ النِّكَاحِ فَهُوَ الْإِيجَابُ وَالْقَبُولُ، وَذَلِكَ بِأَلْفَاظٍ مَخْصُوصَةٍ، أَوْ مَا يَقُومُ مَقَامَ اللَّفْظِ
“নিকাহের মূল ভিত্তি হলো ইজাব ও কবুল। আর তা নির্দিষ্ট কিছু শব্দের মাধ্যমে অথবা শব্দের স্থলাভিষিক্ত কোনো বিষয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।”
—বাদায়েউস সানায়ে, ২/২২৯
একই মজলিসে উপস্থিত বর-কনের ক্ষেত্রে শুধু লিখিতভাবে ইজাব-কবুল করাকে নিকাহের জন্য যথেষ্ট ধরা হয় না। ইবনু নুজাইম (রহ.) বলেন—
لَا يَنْعَقِدُ بِالْكِتَابَةِ مِنَ الْحَاضِرَيْنِ، فَلَوْ كَتَبَ تَزَوَّجْتُكِ فَكَتَبَتْ قَبِلْتُ لَمْ يَنْعَقِدْ
“উভয় পক্ষ উপস্থিত থাকা অবস্থায় শুধু লিখিতভাবে নিকাহ সংঘটিত হয় না। সুতরাং একজন লিখল, ‘আমি তোমাকে বিয়ে করলাম’ এবং অপরজন লিখল, ‘আমি কবুল করলাম’, তবুও নিকাহ সংঘটিত হবে না।”
—আল-বাহরুর রায়েক, ৩/১৪৮
আর শুধু পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বীকার করাও নিকাহের জন্য যথেষ্ট নয়। ইবনু নুজাইম (রহ.) বলেন—
لِأَنَّهُ لَا يَنْعَقِدُ بِالْإِقْرَارِ، فَلَوْ قَالَ بِحَضْرَةِ الشُّهُودِ: هِيَ امْرَأَتِي وَأَنَا زَوْجُهَا، وَقَالَتْ: هُوَ زَوْجِي وَأَنَا امْرَأَتُهُ، لَمْ يَنْعَقِدِ النِّكَاحُ؛ لِأَنَّ الْإِقْرَارَ إِظْهَارٌ لِمَا هُوَ ثَابِتٌ وَلَيْسَ بِإِنْشَاءٍ
“শুধু স্বীকারোক্তির মাধ্যমে নিকাহ সংঘটিত হয় না। সুতরাং কোনো পুরুষ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বলল, ‘সে আমার স্ত্রী এবং আমি তার স্বামী’, আর নারীও বলল, ‘সে আমার স্বামী এবং আমি তার স্ত্রী’, তবুও নিকাহ সংঘটিত হবে না। কারণ, স্বীকারোক্তি হলো পূর্ব থেকে প্রতিষ্ঠিত কোনো বিষয় প্রকাশ করা; এর মাধ্যমে নতুন কোনো সম্পর্ক সৃষ্টি করা হয় না।”
—আল-বাহরুর রায়েক, ৩/১৪৮
প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে, ছেলে ও মেয়ে উভয়ে একই মজলিসে উপস্থিত ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও সাক্ষীদের কথায় কাগজে নিজেদের ‘স্বামী-স্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় লিখে স্বাক্ষর করেছে; কিন্তু নিকাহের ইজাব ও কবুলের কোনো মৌখিক শব্দ উচ্চারণ করেনি এবং কাগজটিও কাবিননামা বা ইজাব-কবুলের দলিল ছিল না। অতএব, শুধু উক্ত লিখিত পরিচয় ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাদের মধ্যে নিকাহ সংঘটিত হয়নি।
সুতরাং—

ক. শুধু কাগজে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় লিখে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়নি।

খ. ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী’—এ ধরনের লিখিত স্বীকারোক্তিও নিকাহের ইজাব-কবুলের বিকল্প নয়। সুতরাং এর দ্বারা বিয়ে সংঘটিত হয় নি।
গ. কাগজে স্বামীর ঘরে ছেলের নাম এবং স্ত্রীর ঘরে মেয়ের নাম লেখা ও উভয়ের স্বাক্ষর করাও এক্ষেত্রে নিকাহ সংঘটিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
ঘ. যেহেতু তাদের মধ্যে নিকাহ সংঘটিত হয়নি, তাই এ সম্পর্কের ভিত্তিতে তাদের পরস্পরের সহবাস বৈধ ছিল না।

ঙ. না, হয় নি।
চ. যেহেতু তাদের নিকাহই সংঘটিত হয়নি, তাই মেয়েটিকে ওই ছেলের কাছ থেকে তালাক নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে।
দ্রষ্টব্য: আল-বাহরুর রায়েক, ৩/১৪৮; বাদায়েউস সানায়ে, ২/২২৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭০; আদ্দুররুল মুখতার, ৩/১২; রাদ্দুল মুহতার, ৩/১৩; আল-মুহীতুল বুরহানী, ৩/৮; আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ, ৪১/২৪০।
والله تعالى أعلم بالصواب

উত্তরদাতা
মুফতী আবদুল্লাহ
উপদেষ্টা পরিষদ, কুরআন ও তাফসির, ফিকহ ও ফতোয়া
বিবাহ ও তালাক
পরিসংখ্যান
১৫০
প্রশ্ন নম্বর
১১০
দেখেছেন
৮ অক্টোবর, ২০২৬
প্রকাশিত
? প্রশ্ন করুন